ড. ইউনূসের নোবেল ও গরিবের নো-বেইল
১১ জুলাই ২০১৩ ১৪:২৬ টা ১৪ জুলাই ২০১৩ ১৫:০৬ টা
লুৎফর রহমান হিমেল •
শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। হঠাৎ করে আবার সরব হয়েছেন। বাংলাদেশের শান্তির জন্য নয়, বরং দারিদ্র হঠানিয়া (ইউনূস সাহেবের ভাষ্যমতে) গ্রামীণব্যাংকের ১৯ টুকরা হওয়া ঠেকাতেই তিনি এবার সোচ্চার। দেশের বাজারে যতো অশান্তির হুড়োহুড়িই হোক না কেন, সবিশেষ তার দেখা মেলে না কখনো। অনেকে অবশ্য আক্ষেপ মিশিয়ে অভিযোগ করেন, কই তাকে তো কোনোদিন শহীদ মিনার কিংবা জাতীয় স্মৃতিসৌধে যেতে দেখি না। আমার এ নিয়ে আক্ষেপ বা অনুরাগ-বিরাগ কিছুই নেই। কেউ শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধে যাবেন কীনা সেটা তার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার।
শান্তিতে নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। হঠাৎ করে আবার সরব হয়েছেন। বাংলাদেশের শান্তির জন্য নয়, বরং দারিদ্র হঠানিয়া (ইউনূস সাহেবের ভাষ্যমতে) গ্রামীণব্যাংকের ১৯ টুকরা হওয়া ঠেকাতেই তিনি এবার সোচ্চার। দেশের বাজারে যতো অশান্তির হুড়োহুড়িই হোক না কেন, সবিশেষ তার দেখা মেলে না কখনো। অনেকে অবশ্য আক্ষেপ মিশিয়ে অভিযোগ করেন, কই তাকে তো কোনোদিন শহীদ মিনার কিংবা জাতীয় স্মৃতিসৌধে যেতে দেখি না। আমার এ নিয়ে আক্ষেপ বা অনুরাগ-বিরাগ কিছুই নেই। কেউ শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধে যাবেন কীনা সেটা তার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার।
যাক সে কথা, দেশের সব শুভ আয়োজন থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখা সেই ‘সর্বোচ্চ’ সন্মানিত মানুষটিকেই কীনা এখন মিডিয়ায় নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। দু-চারটি স্পন্সর পত্রিকাতো প্রতিদিন তার নিউজ খুঁজে এনে পারলে প্রথম পাতা, শেষ পাতা, সিটিপাতাসহ সব পাতায় ছাপিয়ে ভরিয়ে ফেলে। টিভিগুলোর পেইড উপস্থাপক আর ভাড়াটে তোতাপাখীরা (টকশো টকার) পারলে তো মুখে ফেনা তুলে ফেলেন ক্ষুদ্রঋণের স্তুতি করে।
আমি নিশ্চিত, লেখার এটুকু পড়েই একটি অংশ যারপরই খুশিতে বাকবাকুম শুরু করে দিয়েছেন এই ভেবে যে, পাইছি একটা কট্টর আওয়ামী সমর্থক। আরেকটি অংশ ক্ষোভে ফুঁসছেন এই ভেবে যে, আমি নির্ঘাত অ্যান্টিবিএনপি, অ্যান্টি অমুকপার্টি, অ্যান্টি তমুকপার্টি ইত্যাদি। ভুল সবই ভুল। আমি কোনো রাজনীতির ধার ধারি না। আমাদের এখন কমন সমস্যা হয়ে গেছে যে, সবকিছুকে রাজনীতিকরণ করে ফেলি আমরা। গ্রামের ক্ষেতের আইল নিয়ে মারামারি লাগলে আমরা সেখানে পক্ষ নেওয়ার আগে খোঁজ করি, মকবুল ভাই কোন দল করে, আর মফিজ ভাই কোন পার্টি। এই অপরাজনীতি আমাদের মধ্যে এমন বিভেদের দেয়াল তুলে দিয়েছে যে, আমরা দেয়ালের ওপাশের ভাল কিছু দেখি না। শুধু সন্দেহ করি, ওপাশে না জানি কী ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে একটি ছোট্ট গল্প বলি, একদল ডাকাত একবার একটি ব্যাংকে ঢুকল ডাকাতির জন্য। উপস্থিত গ্রাহক আর কর্মচারীরা বাধা দেবার চেষ্টা করলেন। ডাকাতেরা তখন বলল "ভাইসব, টাকা গেলে সরকারের যাবে, আর প্রাণটা? এটা গেলে যাবে আপনার। আপনারাই বুঝুন কোনটা বাঁচাবেন।" ডাকাতদের এই কথা শুনে সবাই 'বুঝতে (!)' পেরে যার যার মতো নিজ নিজ জায়গায় বসে গেল। ডাকাতরা নির্বিঘ্নে টাকা নিয়ে চলে গেল।
আমরা জনগণ হচ্ছি ওই ব্যাংকের গ্রাহক-কর্মচারীদের মতো। নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য অপরাজনীতিক আর মহাজনদের সুযোগ করে দিই আর নিজেরা পরস্পর কাইজ্জা-কলহে লিপ্ত হই। আর এই সুযোগটাই লুফে নিয়ে আমাদের হাড্ডিসার গরিবদের অস্থিমজ্জাটুকু শুষে নেয়ার জন্য সৃষ্টি হয় আধুনিক যুগের কাবুলিওয়ালা আর মহাজনী গ্রামীণব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান। ‘নোবেল’ নয়, গ্রামীণ ব্যাংক যদি ‘ইয়েসবেল’ও পায় তবুও আমি বলব, এই ব্যাংক কোনো ভূমিহীনকে তার ঋণজাল থেকে উদ্ধার কিংবা স্বাবলম্বী করতে পারে নি। জিনেদিনে জিদান আর হিলারি রডহ্যামরা এলে ইউনূস সাহেব তাদের নিয়ে যান সাভার আর গাজীপুরের সাজানো পাপেট গ্রামে। তাৎক্ষণিক রাস্তা তৈরি, বিদ্যুত সরবরাহ, পয়ো নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার এন্তেজাম করে গ্রামকে রূপ দেন উন্নয়ণের মডেল গ্রামে। ওই গ্রামের ডামি সাজিয়ে রাখা কিষান-কিষানীকে শিখিয়ে দেয়া হয় প্রাথমিক ‘হাই-হ্যালো মার্কা’ ইংরেজি। সাজানো সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় জিদান-রডহ্যামরা হয়তো শোনেন চাষিরা এগিয়ে এসে স্মিত হেসে বলছেন, ‘হাই জিদান। হাই হিলারি, হাউ ফিল বাংলাদেশ? উই হ্যাপি। ইয়েস-নো-ভেরি-গুড।‘
গোটা বাংলাদেশের চিত্র কিন্তু এটা নয়। জনাব ড. ইউনূস, জিদান-রডহ্যামদের আপনি ধোকা দিতে পারবেন, বিশ্বের বড় বড় সেমিনারে গিয়ে ক্ষুদ্রঋণের এসব ‘কল্যাণের’ কথা তুলে ধরে বক্তৃতা দিতে পারবেন, যেহেতু আপনি ভাল ইংরেজি পারেন। কিন্তু আপনি আমাদের ষোলো কোটি সাধারণ মানুষকে বোকা বানাতে পারবেন না। তারা হয়তো সংঘবদ্ধ না, এখনো সচেতন না, ভাল করে অনেকে ইংরেজিও পারে না। কিন্তু তারা একদিন জেগে উঠলে ঠিকই কথা বলে উঠবে বাংলায়। সংবাদ সম্মেলনে 'উপস্থাপিত' আপনার ১১ জন নারী পরিচালকই শেষ কথা না। খোঁজ নিয়ে দেখুন, ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ, অপমানিত হয়ে আত্মহনকারী দোহার থানার অভাগী রাবেয়া আর দারিদ্রের দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে ক্ষুদ্রঋণে সর্বস্বান্ত হয়ে মারা যাওয়া সুফিয়ার আত্মা কি বলছে। এ রকম ভুড়িভুড়ি নজির আছে, তালিকাটা আরো বড় হতে পারতো। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক আর গ্রামীণ ফোনের বিজ্ঞাপনের টোপে পড়ে মিডিয়াগুলো সেগুলো চেপে গেছে বেমালুম। কয়দিন চাপা থাকবে এই জুলুম-শোষণ? সত্য প্রকাশিত হবেই। নোবেলের সনদ দিয়ে শোষণযন্ত্র গ্রামীণব্যাংকের বৈধতার আফিম সাধারণ লোকদের খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। সেটা আর এখন খাবেন না জনগণ। তারা ধীরে ধীরে সচেতন হয়ে উঠছেন।
নোবেল পুরুস্কার আপনার ব্যাংকের মাধ্যমে দারিদ্র দূরীকরণের সনদ দেয় না। তবে আপনার নিজের দারিদ্র দূরীকরণের শতভাগ গ্যারান্টি দেয় বৈকি। নোবেল পুরুস্কার, অস্কার পুরুস্কার এগুলো কী জিনিস আমরা জানি, বিশ্ববাসীও জানে। শান্তিতে প্রতিবছর নোবেল পুরষ্কার প্রদান করে যে কমিটি (নরওয়ের নোবেল শান্তি কমিটি) তার পাঁচজন সদস্যের কেউই কিন্তু স্বনামখ্যাত বিতর্কহীন কোন ব্যক্তিত্ব নন। সকলেই কোন না কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। এক সময়ের কমিটি চেয়ারম্যান থরবোর্ন জ্যাগল্যান্ড নরওয়ের লেবার পার্টির সদস্য। ২০০৬ সালে চেয়ারম্যান ছিলেন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্য ওলে ড্যানবোল্ট (2003–2008: Ole Danbolt Mjøs), যিনি ড. ইউনূসকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করেন। কমিটির বাকি চারজন সদস্যদের মধ্যে ক্যাসি কুলম্যান ফাইভ একাধারে একজন ব্যবসায়ী এবং কনজারভেটিভ পার্টির সদস্য। চরম বিতর্কিত উগ্র মার্কিনপন্থী এই সদস্যের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ২০০৭ সালে সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর এবং ২০০৯ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে নোবেল শান্তি পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। সিসেল রনবেক হলেন কমিটির অপর সদস্য যিনি একজন রাজনীতিক এবং সাবেক মন্ত্রী। ইঙ্গার ম্যারি ইটারহর্ন এবং এগোট ভেইল যথাক্রমে নরওয়েজিয়ান প্রগ্রেস ও সোশ্যালিস্ট লেফট পার্টির সদস্য, পেশায় যথাক্রমে পার্লামেন্টের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টিটিভ এবং ফিজিওথেরাপিস্ট। তাদের অখ্যাতি এবং পেশার বিবরণ শুনে সচেতনমানসে তাই স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, যে কমিটির পাঁচজন সদস্যের সকলেই রাজনৈতিক দলের সদস্য, কেউ ব্যবসায়ী কিংবা ফিজিওথেরাপিস্ট, তারা বিশ্বশান্তির কি এমন বোঝেন?
নরওয়ের বুদ্ধিজীবী সমাজের কাউকে কমিটিতে না রেখে সব রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের স্থান দিয়ে নরওয়েজিয়ান সরকার কি নোবেল শান্তি পুরস্কারকে একটি হাস্যকৌতুকে পরিণত করে তোলেন নি? নোবেল শান্তি কমিটিকে নোবেলবিজয়ী নির্ধারণে সহযোগিতা করে নরওয়েজিয়ান নোবেল ইন্সটিটিউট। সংস্থাটির চেয়ারম্যান গ্যের লুন্ডস্ট্যাড একজন ইতিহাসবিদ, যিনি শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের মধ্যেকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে লেখালেখি করেন। অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ওলাভ নোলস্ট্যাড, দ্যাগ কুল গোটোভ্যাক, সিগরিড ল্যাঞ্জব্রেক, অ্যানি সেসিল জেলিং, টোরিল জোহানসেন এবং বর্ন হেলগে ভ্যাঞ্জেন। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন, এদের কেউই বিশ্বনন্দিত কিংবা বড়মাপের ব্যক্তিত্ব নন। উইকিপিডিয়া কিংবা গুগল সার্চ করলেও ব্যাপারটির সত্যতা মিলবে। নরওয়ের এই অখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ কাকে নোবেল প্রাইজ দিলেন আর কাকে দিলেন না, সেটি তারা তলিয়ে দেখেন না। প্রয়োজনও বোধ করেন না। লবিটাই সেখানে আসল।
ফ্ল্যাশব্যাকে একটু পেছনে ফিরে যাই। নোবেল শান্তি পুরষ্কারের প্রবর্তক সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল যদি তার জীবদ্দশায় জানতেন যে, তার নামে আজকাল কিছু অপরিচিত অখ্যাত রাজনীতিকেরা অশান্তি কায়েমকারী কূটনীতিক-রাষ্ট্রপ্রধান আর উচ্চ সূধের কারবারি মহাজনদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে, তাহলে লজ্জায় অপমানে তার মাথা হেট হয়ে যেত।
আমাদের এখনো মনে আছে, ২০০৬ সালে ড. ইউনূসকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দিতে যেয়ে নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে তিনি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন। বিল ক্লিনটনের প্রসঙ্গটিও তখন উল্লেখ করা হয়। এ সময় আরো বলা হয়, ইউনূসকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে নোবেল কমিটি ইসলাম ও পশ্চিমের দূরত্ব হ্রাস করতে চায়। এছাড়া নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম করা ও বিশ্বব্যাপী দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অংশ হিসেবে ড. ইউনূস কে নোবেল কমিটি এ সম্মাননা প্রদান করছে। ইসলাম ও পশ্চিমের দূরত্ব কতটুকু হ্রাস হয়েছে? পাঠকরাই ভাল বলতে পারবেন।
প্রশ্ন হলো, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে আমাদের দেশের মত এমন নিদারুণ দারিদ্র নেই, তাই দারিদ্র বিমোচনের জন্য ক্ষুদ্রঋণের বিশেষ প্রয়োজনও নেই তাদের। তবে ব্যবসাবাণিজ্যই যদি মূল উদ্দেশ্য হয়, যার মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জন, তবে হাজারটা ক্ষুদ্রঋণদান প্রতিষ্ঠান খোলাতো যেতেই পারে। ক্ষুদ্রঋণ একটি মহাজনি ব্যবসা, সুদসহ আসল না পেলে মহাজন যেমন জমি ও বসতভিটা ক্রোক করে নেয়, তেমনি গ্রামীনব্যাংক কর্মকর্তারা ঠিক সময়ে সুদসহ আসল না পেলে জমিজমা-বসতবাড়ি-টিনের চালা, হাঁসমুরগী-গরুবাছুর, হাঁড়িপাতিল-আসবাবপত্র, নাক-ফুল-অলংকারাদি জোরপূর্বক নিয়ে যায়। এমনি অত্যাচারের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছেন দোহার থানার অভাগী রাবেয়া, দারিদ্রের দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে ক্ষুদ্রঋণে সর্বস্বান্ত হয়ে মারা যান সুফিয়া, এরকম ভুরিভুরি উদাহরণ আমাদের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। এসব শোকগাঁথার সামাণ্যতম ছিটেফোটা তুলে ধরেছেন ডেনমার্কের নামকরা সাংবাদিক টম হেইনম্যান তার বহুল আলোচিত ‘Caught in micro debt’ প্রামাণ্যচিত্রে। প্রকৃতপক্ষে, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গ্রামজনতার দারিদ্র যদি আসলেই বিমোচিত হতো, তাহলে তাদের পরনে নোংরা মলিন ছিন্ন পোশাক থাকতো না, ছেঁড়া গেঞ্জি লুঙ্গি ছেড়ে তারা প্যান্ট শার্ট ধরত, ছেলেমেয়েদের স্কুল-কামাই করে আর বাবার সঙ্গে ক্ষেতে-খামারে হালচাষ করতে হতো না, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ এতদিনে ব্যবসাকেন্দ্রিক শিল্পপ্রধান দেশে পরিণত হতো। দারিদ্র বিমোচনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও রাষ্ট্রিক বা আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় এর কোন সরাসরি (Direct) ভূমিকা নেই। দারিদ্র বিমোচিত (ভূমিহীণ ব্যক্তির দারিদ্রবিমোচনও এ ফর্মূলায় সম্ভব নয়) হওয়ার পরেও জাতিগত কিংবা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিভেদের কারণে শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে।
ভিয়েতনামের লি ডাক থো শান্তিতে নোবেল পেয়েও এ কারণেই দৃঢ়চিত্তে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন,''There is still no peace in Vietnam''। ড. ইউনূস যদি ওনার মতোই সৎ ও নিষ্ঠাবান বড়মাপের মানুষ হতেন, নোবেল প্রত্যাখ্যান করে বলতেন, ''স্যরি, বাংলাদেশে এখনো শান্তি আসেনি, আর দারিদ্রও বিমোচিত হয়নি।'' কিন্তু ড. ইউনূস দেশ ও মানুষের কথা কোনদিন ভাবেননি, ডিগ্রি ও পুরস্কার প্রাপ্তি তথা বিপুল বিত্ত অর্জন করাই তার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান-ভাবনা, তাই খুশিতে আত্মহারা হয়ে পুরস্কার নিতে চলে গিয়েছিলেন নরওয়েতে। এখনো তিনি গোল্ড মেডেল, প্লাটিনাম মেডেল সংগ্রহ করে চলেছেন। এসব মেডেল সংগ্রহ করে কী হবে, যদি না শান্তির বন্দোবস্ত করা যায়।
জনাব ড. ইউনূস ২০০৬ সালে নোবেল পাওয়ার পর লোক দেখানোর জন্য আর সমালোচনা থেকে বাঁচতে একবার মাত্র শহীদ মিনারে ও স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন, জীবনে আর কোনদিন ওপথ মাড়াননি। তিনি মধ্যবিত্ত শিক্ষক থেকে সুদের রমরমা ব্যবসা করে আজকে বিপুল বিত্তবান হয়েছেন, কিন্তু গরীবের অবস্থার উন্নতি হয়নি, তার মানে বিপুল অর্থ দিয়ে কিনতে হয়েছে ড. ইউনূস প্রচারিত দারিদ্র দূরীকরণের আফিম, সেই মাদকের মাদকতায় বিভ্রান্ত সহজসরল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই অমানুষিক হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করে ঋণ শোধ দিয়ে কোনমতে বেঁচে আছে, আবার কেউ চরম মূল্য দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে, গেছে কারো একমাত্র জীবনটিও। গণমাধ্যমের কল্যাণে তার একটা অনুসারী শ্রেণী তৈরি হয়েছে যারা ক্ষুদ্রঋণের সেই ভয়াবহ রূপটি সম্পর্কে জানেন না, নাগরিক ব্যস্ততায় মাঠ পর্যায়ে গিয়ে তাদের জানার সুযোগও নেই। কেউ মাঠে গিয়ে জানলে আমার এ লেখা সার্থকতা পেতো।
শান্তি দূরঅস্ত
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন-মিশরের শান্তিচুক্তি একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে, তবুও ইয়াসির আরাফাত, আইজ্যাক রবিন, শিমন পেরেজ, মেনাশিম বেগিন ও আনোয়ার সাদাতেরা নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেয়েছেন। এ কারণেই শান্তির নোবেল নিয়ে কথা বলাটা অনেকে বাদই দিয়েছেন। এ নিয়ে আলোচনাটাও বেগার খাটা।
তবুও কথা থেকে যায়
ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তির পেছনে বিল ক্লিনটনের লবি থাকলেও সবচেয়ে বড় অবদানটি আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর তথা গ্রামীনফোনের সাবেক ব্যবসায়িক পার্টনার টেলিনরের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ড. ইউনূসের বিশিষ্ট বন্ধু স্টেইন টোনেসনের। তিনি ড. ইউনূসকে নোবেল বিজয়ী করার পেছনে বড় তদবিরটা করেন।
ড. ইউনূসের নোবেল প্রাপ্তির পেছনে বিল ক্লিনটনের লবি থাকলেও সবচেয়ে বড় অবদানটি আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইন্সটিটিউটের ডিরেক্টর তথা গ্রামীনফোনের সাবেক ব্যবসায়িক পার্টনার টেলিনরের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ড. ইউনূসের বিশিষ্ট বন্ধু স্টেইন টোনেসনের। তিনি ড. ইউনূসকে নোবেল বিজয়ী করার পেছনে বড় তদবিরটা করেন।
আরেকটি উদাহরণ দিলে আরো স্পষ্ট হবে নোবেল শান্তি পুরস্কারটি এখন কতোটা ভিত্তিহীন অন্তসারশূণ্য পুরস্কার। অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রবক্তা বিশ্ব জুড়ে মহাত্মা এবং বাপুজি নামে পরিচিত মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর কপালে কিন্তু এ পুরুস্কার জোটেনি। গান্ধীর মত এত বড় সমালোচনাহীন শান্তিপ্রিয় ব্যক্তিত্ব নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন না, আর সেখানে তারচে মানে-গুণে নগণ্য অনেক ব্যক্তিই নোবেল পেয়ে চলেছেন, বিষয়টি সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে এ পুরুস্কারের অসারতা। দেখুন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ইউনূস নিয়ে মাতামাতি নেই, কমিউনিস্টপন্থী নব্যশক্তি চীনে ইউনূস নিয়ে অতিমাত্রার হুজুগ নেই। ভারতে ইউনূস নিয়ে মাতামাতি নেই, শুধু আমেরিকা ফ্রান্স আর জাপানই সব নয়, চীন এবং ভারতে তাদের চেয়েও বেশি জনসংখ্যা এবং দুটি দেশে ড. ইউনূসকে মাতামাতি নেই। জাতিসংঘের কাছেও ড. ইউনূসের কদর কোথায়? আমেরিকা চায়, তার স্বার্থ চরিতার্থ করতে। এজন্য ড. ইউনূস সাহেবকে বাংলাদেশের ক্ষমতার নেপথ্যে রাখতে। যাতে আমেরিকার অনুগ্রহে কৃতজ্ঞভাজন হয়ে দেশের যাবতীয় তেল গ্যাস ও অন্যান্য রিসোর্স আমেরিকায় ধীরে ধীরে পাচার করা যায়। আমেরিকা সকল দেশে তাদের নিজস্ব লোকজনকে সরকারে বা ক্ষমতার নেপথ্যে বসিয়ে ওই দেশগুলোকে একপ্রকার কলোনী বানিয়েই ফায়দা লোটে। যেমন ইসলামের সূচনা হয়েছিল যেই দেশে, সেই দেশ সৌদি আরব এখন আমেরিকারই তাঁবেদারি করে চলে, আমেরিকা যেভাবে বলে সেভাবে করে। আশা করি, পরিষ্কার হয়েছে ক্যাপিটালিস্টদের উদ্দেশ্য। এটা বোঝার জন্য আওয়ামী লীগ-বিএনপি করতে হবে না। শুধু একটু দেশপ্রেমী হোন। দয়া করে দেশটাকে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করার কথা ভাবুন। গ্রামীণব্যাংক থাকলে আগামি ৩০ বছরের মধ্যে দারিদ্র যাদুঘরে যাবে না, যাবে দরিদ্ররা। তাই সোচ্চার হোন। আমরা সোচ্চার না হলে পৃথিবী জানবে না, কী ভুল বারতা তারা ২০০৬ সাল থেকে পেয়ে এসেছে। দয়া করে সবকিছুতে রাজনীতি খুঁজবেন না।
গ্রামীণব্যাংকের মাঠ পর্যায়ে কিছুক্ষণ
কিস্তি আদায়কারীদের স্থানীয় পর্যায়ে ‘মাস্টার সাহেব’ বলে সম্বোধন করা হয়। মাস্টার মানে প্রভূ, ঋণ গ্রহিতারা দাস। এই মাস্টার সাহেবদের সাইকেলের টুংটাং কিংবা মোটরসাইকেলের শব্দ শুনলেই আঁৎকে উঠেন ঋণগ্রহীতারা। ঘরের কাজ, রান্নাবান্না ফেলে যে যেভাবে পারেন সেভাবেই পালিয়ে যান তারা। কেন পালাবেন আমার হতদরিদ্র মা-বোনেরা?
গ্রামীণব্যাংকের মাঠ পর্যায়ে কিছুক্ষণ
কিস্তি আদায়কারীদের স্থানীয় পর্যায়ে ‘মাস্টার সাহেব’ বলে সম্বোধন করা হয়। মাস্টার মানে প্রভূ, ঋণ গ্রহিতারা দাস। এই মাস্টার সাহেবদের সাইকেলের টুংটাং কিংবা মোটরসাইকেলের শব্দ শুনলেই আঁৎকে উঠেন ঋণগ্রহীতারা। ঘরের কাজ, রান্নাবান্না ফেলে যে যেভাবে পারেন সেভাবেই পালিয়ে যান তারা। কেন পালাবেন আমার হতদরিদ্র মা-বোনেরা?
সরেজমিন ঘুরে রাজশাহীর সীমান্তবর্তী পদ্মাপারের সোনাইকান্দি, বেড়পাড়া, হরিপুর, নিমতলা, খোলাবোনা, আলীপুর, প্রেমতলী, গোদাগাড়ীর গ্রামে গ্রামে এমন ভীতসন্ত্রস্ত পরিস্থিতি পেয়েছেন স্থানীয় সংবাদকর্মীরা। কিস্তির টাকা জোগাড় করা নিয়ে ঘরে ঘরে ঝগড়াঝাটি, কান্নাকাটির রোল। ভুক্তভোগিরা বলেছেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের মহাজনী সুদের ঋণ গ্রামবাসীর জন্য অশান্তির অভিশাপ এখন। এটা শুধু রাজশাহীর সীমান্তবর্তী গ্রাম নয়, গোটা দেশের অভাবী এলাকারই চিত্র।
রাজশাহী মহানগর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়কের পাশেই হরিপুর। পদ্মা নদীর তীর ঘেষা এ জনপদে অভাবি মানুষের বসবাস। নদী ভাঙ্গনের কারণে বেশিরভাগ পরিবারই বিপন্ন প্রায়, কর্মসংস্থানের নিশ্চিত কোনো উপায় নেই। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় হরিপুর ইউনিয়নের কিছু সংখ্যক লোক চোরাকারবারে জড়িত থাকলেও বাকিরা কঠোর পরিশ্রম করে কোনোরকমে দু’মুঠো আহার জোটান।
রাজশাহী মহানগর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সড়কের পাশেই হরিপুর। পদ্মা নদীর তীর ঘেষা এ জনপদে অভাবি মানুষের বসবাস। নদী ভাঙ্গনের কারণে বেশিরভাগ পরিবারই বিপন্ন প্রায়, কর্মসংস্থানের নিশ্চিত কোনো উপায় নেই। ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় হরিপুর ইউনিয়নের কিছু সংখ্যক লোক চোরাকারবারে জড়িত থাকলেও বাকিরা কঠোর পরিশ্রম করে কোনোরকমে দু’মুঠো আহার জোটান।
স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ কবীর জানান, মাত্রাতিরিক্ত এ অভাবের সুযোগ নিয়ে হরিপুরের গ্রামগুলোতে ১০/১২ বছর আগেই গ্রামীণ ব্যাংক ঢুকে পড়ে। পাশাপাশি ভাগ্য পরিবর্তনের প্রলোভন দিয়ে আশা, ব্র্যাক, ঠেঙ্গামারা মহিলা সমিতিসহ প্রায় এক ডজন এনজিও ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম নিয়ে মাঠে নামে। গ্রামীণ ব্যাংক সর্বপ্রথম গ্রামে গ্রামে নারীদের সমন্বয়ে গ্রুপ গঠন ও তাদের মাঝে ঋণ বিতরণ শুরু করে। হরিপুরের ঋণ গ্রহিতা আছিয়া বেগম (২৬), তানজিলা (২৮), আদিনা (৩৪), সুফিয়া খাতুন (৩৫) সহ কয়েকজন গণমাধ্যমকে জানান, চড়া সুদসহ গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে বেশিরভাগ সদস্যাই ব্যর্থ হন। কিন্তু কিস্তির টাকা আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কমচারীদের বেপরোয়া আচরণের মুখে ঋণ গ্রহিতারা অন্য কোনো এনজিও বা গ্রামীণ ব্যাংক থেকেই আরও বেশি পরিমাণ ঋণ নিয়ে বকেয়া পরিশোধে বাধ্য হন। গ্রামীণের মহিলা গ্রুপের সদস্য সেলিনা বেগম (৩৮) বলেন, ‘অতিরিক্ত সুদ শোধের লাগ্যা বেশি বেশি কিস্তি (ঋণ) লিয়ে ঠ্যালায় পইর্যাছি।‘ তিনি এখন গ্রামছাড়া।
গ্রামছাড়া শুধু এক নাসিমা নন, কিস্তি পরিশোধের ব্যর্থতা ও ব্যাংক কর্মচারীদের অব্যাহত চাপের মুখে দিশেহারা অবস্থায় ঘরবাড়ি ফেলে পালিয়ে গেছেন বেড়পাড়া গ্রামের ফুলী বেগম (৩৫)| স্বামী ভাদু মিয়া। গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তি আদায়কারী কর্মকর্তারা পাওনা আদায়ের জন্য ফুলী বেগমের বাড়ি চড়াও হন এবং অন্য সদস্যদের সহযোগিতায় তার ঘরের টিনের চালা খুলে নিয়ে ৬ হাজার টাকা বিক্রি করে দেন। সোনাইকান্দি গ্রামের মৃত টুকু মিয়ার স্ত্রী লতিফা বেগম (৩০), সালেক মিয়ার স্ত্রী জরিনা খাতুন (৩২), হরিপুরের রীতা বেগম (২৫), পিতা আশরাফ আলী, ববিতা আক্তার (১৬) পিতা বকুল মিয়া। কিস্তি ঋণ নিয়ে ঝুট-ঝামেলার কারণে বকুল মিয়া তার স্ত্রী সেলিনা বেগম (৪০) কে পিটিয়ে বাড়িছাড়া করে তালাক দেন। হরিপুরের ব্যবসায়ি মামুন মিয়া, ইউপি সদস্য মেকাইল হোসেন, স্কুল শিক্ষক তবিবুর রহমানসহ কয়েকজন জানান, প্রতিটা গ্রামেই কিস্তি নেওয়া ৫/৭ টা করে পরিবার গ্রাম ছেড়ে পালানোর নজির আছে। কিস্তি-সুদের ঋণ তাদের জন্য এখন গলায় ফাঁস। শুধু গ্রামীণব্যাংক নয়, অন্যান্য এনজিওগুলোও একই কায়দায় সবাইকে সর্বশান্ত করে চলেছে।
রাজশাহীর বেড়পাড়া সীমান্ত এলাকায় খাটাপাড়া গ্রামের টুলু বেগম। গ্রামীণ ব্যাংকের নথিপত্রে আছে-‘টুলু বেগম (৫২) এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে গবাদিপশুর চমৎকার একটি খামার গড়েছেন, তিনি এখন পুরোপুরি স্বনির্ভর নারী।‘ তাকে সফল খামারি ও ভাগ্য পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত বলেও গর্ব করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। কিন্তু বাস্তবে খাটাপাড়া গ্রামে টুলু বেগমের বাড়ি পৌঁছে গর্ব করা তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
যুক্তিবিদ্যার ক্লাসযুক্তিবিদ্যার তত্ত্ব দিয়ে যে নোবেল দেয়া যায় তা আমরা দেখেছি ২০০৬ সালে। সে বছর নোবেল দেয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল, ড. ইউনূস সাহেব গরিবের পকেট ভরিয়ে দিয়েছেন। পকেটে টাকা আছে তো শান্তি আছে। অর্থনীতির এ তত্ত্ব আবিস্কারের জন্য অর্থনীতিতে পুরুস্কারটা পেলে আলোচনার বিষয় হতো বটে। কিন্তু পেলেন শান্তিতে। এটা ঠিক সেই কলেজে পড়া যুক্তিবিদ্যার ক্লাসের মতো- ‘বইটি টেবিলের ওপর, টেবিলটি মাটির ওপর। সুতরাং বইটি মাটির ওপর আছে’র মতো।
ড. ইউনুস যাই করুন না কেন, তিনি যে সর্বোচ্চ সম্মানের সাইনবোর্ডধারী নোবেল বিজয়ী, আর তার সাথে সুসম্পর্ক বহাল আছে বিশ্বমোড়ল মার্কিন মুল্লুকের এটাই যে এই মুহুর্তে আমাদের কতিপয় মিডিয়া আর কথিত বুদ্ধিজীবীকে অতি উৎসাহী করছে তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার-এটা দিনের মতো পরিস্কার। সম্প্রতি তার পক্ষে যেভাবে স্তুতিবাক্য উপস্থাপন করলেন আমাদের সমাজের কয়েকজন গুণধর পেশাজীবী ও রাজনীতিবিদ তাতে আমাদের বোধ হচ্ছে, ড. ইউনূস না জন্মালে, তিনি এই দেশে না এলে সহস্র মাইল দূরের কোনো আবর্জনার দেশ হিসেবে গণ্য হতো এই দেশ। রাজনীতিকদের একটি অংশ এখন এই দারিদ্র তাড়ানিয়া হ্যামিলনের বাশিওয়ালা ওরফে পীরের ক্ষুদ্রঋণের পানিপড়া খাওয়ার অভিলাষে তার বাসায় ছুটছেন যাতে মার্কিন প্রভূদের মন গলিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া যায়। সরকারি দলও পানি পড়ার জন্য ছুটতো মসনদে টিকে থাকার অভিপ্রায়ে। কিন্তু আগেই পরিবেশ ঘোলাটে করায় তারা সেই সুযোগটি নিতে পারছে না।
ড. ইউনূস নিজেও ২০০৭ সালের দিকে তার একটি প্রচারপত্রের (পত্রিকা) সম্পাদকের পরামর্শে 'নাশ' (সর্বনাশ নয় কিন্তু) বা নাগরিক শক্তি নামের একটি রাজনৈতিক দলের দোকান খুলতে চেয়েছিলেন। মাঠ পর্যায়ে জরিপ চালিয়ে তিনি যখন দেখলেন, তার সব আসনেই জামানত বাজেয়াপ্ত হবে, তখন সেই ইচ্ছে তিনি ত্যাগ করেন।
গরিবের নো বেইল (জামিন নাই)
বণ্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সুনামি, টর্নোডোর মতো প্রলয়ংকরী দুর্যোগে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায় আমার দেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ। প্রকৃতির রুদ্ররোষ তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারে না। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট মহাজনি ঋণজালের কারাগার থেকে আমার দেশের গরীবের মুক্তি মেলে না। এ জাল ছিড়ে বের হতে পারে না তারা। এ বড় কঠিন জাল। এ চক্র বড় কঠিন।
বণ্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সুনামি, টর্নোডোর মতো প্রলয়ংকরী দুর্যোগে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায় আমার দেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ। প্রকৃতির রুদ্ররোষ তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারে না। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট মহাজনি ঋণজালের কারাগার থেকে আমার দেশের গরীবের মুক্তি মেলে না। এ জাল ছিড়ে বের হতে পারে না তারা। এ বড় কঠিন জাল। এ চক্র বড় কঠিন।
চলুন, একটি ট্রাজেডি চলচ্চিত্রের মন্তাজ (Montage) কল্পনা করি
চলচ্চিত্রে মন্তাজ একটি অতি উচ্চমানের নান্দনিক উপস্থাপনা। পরপর কয়েকটি দৃশ্যের একের পর এক আগমনে ভিন্ন একটি ব্যঞ্জণা তৈরিই থাকে লক্ষ্য। মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিনথিসিসের ওপর ভিত্তি করে আইজেনস্টাইন-এর তত্ত্ব এটা। দুটি পাশাপাশি শটের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বিষয়টাকে তৃতীয় আরেকটি অবস্থানে নিয়ে যায়। এইভাবে শটে শটে সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই বক্তব্য এগিয়ে চলে। অর্থাৎ ১+১ = ২ হয় না, হয় ৩| আইজেনস্টাইনের মতে এটাই হচ্ছে দ্বান্দ্বিক সিনেমা। গ্রামীণব্যাংক, ড. ইউনূস, দোহারের রাবেয়াদের আত্মহনন দ্বান্দ্বিক ট্রাজেডি সিনেমার মন্তাজের কথাই আমাদের আবার স্মরণ করিয়ে দেয়।
এবার আমরা দুটো দৃশ্যকল্প কল্পনা করে দেখব। বাকি দৃশ্যটা পাঠকদের জন্য জমা থাকল। তারা নিজেরা কল্পনা করে নেবেন।
দৃশ্য এক. মহাজন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের মেডেল গলায় পরছেন।
দৃশ্য দুই. ঠিক একই সময়ে পৃথীবির অপরপ্রান্ত বাংলাদেশ নামের একটি দেশের দোহার নামের এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের রাবেয়া ব্যাংককর্মীদের অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে গলায় পড়ছেন ওড়না।
চলচ্চিত্রে মন্তাজ একটি অতি উচ্চমানের নান্দনিক উপস্থাপনা। পরপর কয়েকটি দৃশ্যের একের পর এক আগমনে ভিন্ন একটি ব্যঞ্জণা তৈরিই থাকে লক্ষ্য। মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিনথিসিসের ওপর ভিত্তি করে আইজেনস্টাইন-এর তত্ত্ব এটা। দুটি পাশাপাশি শটের মধ্যকার দ্বন্দ্ব বিষয়টাকে তৃতীয় আরেকটি অবস্থানে নিয়ে যায়। এইভাবে শটে শটে সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই বক্তব্য এগিয়ে চলে। অর্থাৎ ১+১ = ২ হয় না, হয় ৩| আইজেনস্টাইনের মতে এটাই হচ্ছে দ্বান্দ্বিক সিনেমা। গ্রামীণব্যাংক, ড. ইউনূস, দোহারের রাবেয়াদের আত্মহনন দ্বান্দ্বিক ট্রাজেডি সিনেমার মন্তাজের কথাই আমাদের আবার স্মরণ করিয়ে দেয়।
এবার আমরা দুটো দৃশ্যকল্প কল্পনা করে দেখব। বাকি দৃশ্যটা পাঠকদের জন্য জমা থাকল। তারা নিজেরা কল্পনা করে নেবেন।
দৃশ্য এক. মহাজন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের মেডেল গলায় পরছেন।
দৃশ্য দুই. ঠিক একই সময়ে পৃথীবির অপরপ্রান্ত বাংলাদেশ নামের একটি দেশের দোহার নামের এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের রাবেয়া ব্যাংককর্মীদের অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে গলায় পড়ছেন ওড়না।
মহাজনের গলায় মেডেল ঝুলল, রাবেয়াও আড়ার সাথে ঝুললেন। মেডেল ঈষৎ ঘুরছে, রাবেয়ার ঝুলন্ত দেহটাও সুন্দর ঘুরপাক খাচ্ছে। রাবেয়ার মৃত্যু গোঙানির শব্দ, স্বজনদের আহাজারি দারুন আবহ সঙ্গীতের সৃষ্টি করছে।
নাটকের ওই প্রান্তে মার্কিন মুলুকের জমকালো অনুষ্ঠানে মহাজনের মৃদু হাসি আর মুহুর্মূহু তালির শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে রাবেয়ার গোঙানি আর স্বজনের আহাজারির শব্দ।
দৃশ্য তিন. নিতান্তই পাঠকদের চিন্তার প্রতিফলন। অন্ধ রাজনীতি করলে তিনি সেভাবেই দৃশ্যকল্প চিন্তা করবেন। সাধারণ মন ও মনন সমৃদ্ধ বিবেকবান মানুষ হলে তিনি হয়তো ভিন্নভাবে চলচ্চিত্রটির যবনিকা টানবেন।
দৃশ্য তিন. নিতান্তই পাঠকদের চিন্তার প্রতিফলন। অন্ধ রাজনীতি করলে তিনি সেভাবেই দৃশ্যকল্প চিন্তা করবেন। সাধারণ মন ও মনন সমৃদ্ধ বিবেকবান মানুষ হলে তিনি হয়তো ভিন্নভাবে চলচ্চিত্রটির যবনিকা টানবেন।
লেখক : সম্পাদক, পরিবর্তন ডটকম
রহমান ভাই
No comments:
Post a Comment